জাতীয়

পাপিয়া নেটওয়ার্কের প্রভাবশালীরা নিজেদের বাঁচাতে দিশেহারা

যুব মহিলা লীগের বহিস্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ডেরায় মনোরঞ্জনের জন্য যে সব প্রভাবশালীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন তারা নিজেদের বাঁচাতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অনেকে নিজেদের বাঁচাতে নান উপায় খুঁজছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে গাঁ ঢাকা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ওয়েস্টিন হোটেলের লেভেল-২২ এ এক হাজার ৪১১ বর্গফুট জায়গাজুড়ে বিলাসবহুল প্রেসিডেনসিয়াল স্যুট। সেখানে অতিথিদের নিয়ে সুন্দরী তরুণীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বৈঠক করতেন পাপিয়া। এরপর পছন্দসই তরুণীকে নিয়ে গোপন কক্ষে প্রবেশ করতেন ভিআইপিরা। ওয়েস্টিনের ২২ তলায় চার বেডরুমের ওই স্যুটের প্রতিরাতের ভাড়া সাধারণভাবে দুই হাজার ডলারের মতো।

পাপিয়ার গড়ে তোলা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ডেরায় নিয়মিত যাতায়াত ছিল বেশ কয়েকজন এমপি, সচিব, রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ীর। জানা গেছে, দুদকের কাছে ইতিমধ্যে এই হোটেল কর্তৃপক্ষ পাপিয়ার ভাড়া করা প্রেসিডেনশিয়াল স্যুটসহ কয়েকটি কক্ষে যাতায়াতকারীদের একটি তালিকা হস্তান্তর করেছে। এমন খবরে পাপিয়ার ডেরার মেহমান সেসব এমপি, সচিব, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এদের মধ্যে যারা পাপিয়ার ডেরায় প্রটোকল ছাড়া হাজির হতেন, তারা এখন গোপন ভিডিও ফাঁসের আতঙ্কে আছেন। ফলে নিজেদের বাঁচাতে নানা উপায় খুঁছেন তারা।

Ad by Valueimpression
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে পাপিয়ার অনৈতিক কর্মকা-ের সাথে জড়িতদের নামের তালিকা। এতে বেশ কয়েকজন সচিব, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও এমনকি সংসদ সদস্যসহ একাধিক ভিআইপির নাম রয়েছে। সেই তালিকা নিয়ে সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এ তালিকার ব্যাপারে কোনো সত্যতা নিশ্চিত করেনি পাপিয়ার মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে তালিকাটি ‘মনগড়া প্রচারণা’ মন্তব্য করে গত মঙ্গলবার ডিএমপির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তদন্তকারী কর্মকর্তা ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের থেকে এমন তালিকা দেয়া হয়নি।

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত জানায়, পাপিয়অ ও তার স্বামী সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে ডিবি। জেরার মুখে নিত্য নতুন তথ্য দিচ্ছেন তারা। কয়েকজন আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতার নামও প্রকাশ করেছেন পাপিয়া। তবে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। কারণ কাউকে অকারণে ফাঁসানোর চেষ্টা হতে পারে।

জানা গেছে, অভিজাত হোটেলে তরুণীদের দিয়ে অনৈতিক দেহ ব্যবসার কাজে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু পাহাড়ি তরুণীদেরও ব্যবহার করতেন পাপিয়া ও তার স্বামী সুমন। বিভিন্ন প্রলোভনে তাদের ঢাকায় এনে ওয়েস্টিন হোটেল ও তাদের ফার্মগেটের বাসার ডিসকো পার্টিতে ভিআইপি কাস্টমারদের সরবরাহ করতেন। গ্রেফতার হওয়ার চার-পাঁচ দিন আগেও পাহাড়ি তরুণীদের সংগ্রহ করতে খাগড়াছড়ি ছিলেন পাপিয়া। তবে সঙ্গে করে কোনো তরুণীকে নিয়ে এসেছিলেন কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাপিয়া ও তার সহযোগীরা জিজ্ঞাসাবাদে ওয়েস্টিনে কে কে যেতেন এবং তার অনৈতিক কাজের সাথে কারা জড়িত সে বিষয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার প্রভাবশালী লোকজন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে পাপিয়া স্বীকার করেছেন, নারী ব্যবসার আড়ালে মুদ্রাপাচার ছিল তার অন্যতম বাণিজ্য। বেশ কয়েকটি দেশের অ্যাকাউন্টে তার অর্থ রয়েছে। এ তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে পাপিয়ার মানি লন্ডারিংয়ের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। যাচাই-বাছাইয়ের পর যদি তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিআইডির ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি সাংবাদিকদের জানান, পাপিয়ার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য জানতে ইতিমধ্যেই দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থাকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্য পুরো তথ্য হাতে পাওয়া যাবে। সেসব তথ্য হাতে পাওয়ার পর মানি লন্ডারিংয়ে যদি পাপিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণিত হয় তবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি রোববার গোপনে দেশত্যাগের সময় নরসিংদী জেলা যুব মহিলা লীগের সেক্রেটারি শামিমা নূর পাপিয়াকে বিমানবন্দর এলাকা থেকে তিনসহযোগীসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। গ্রেফতার অন্য তিনজন হলেন- পাপিয়ার স্বামী ও তার অবৈধ আয়ের হিসাবরক্ষক মফিজুর রহমান ওরফে সুমন চৌধুরী ওরফে মতি সুমন, পাপিয়ার ব্যক্তিগত সহকালী শেখ তায়্যিবা ও সাব্বির খন্দকার। এই নেত্রীর প্রকাশ্য আয়ের উৎস গাড়ি বিক্রি ও সার্ভিসিংয়ের ব্যবসা। তবে এর আড়ালে জাল মুদ্রা সরবরাহ, বিদেশে অর্থপাচার এবং অবৈধ অস্ত্র রাখাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাপিয়া গ্রেফতার হওয়ার পরই বেরিয়ে আসতে শুরু করে তার অন্ধকার জগতের চাঞ্চল্যকর কাহিনী।

এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি হোটেল ওয়েস্টিনের প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট এবং ফার্মগেটের ২৮ নম্বর ইন্দিরা রোডের রওশনস ডমিনো রিলিভো নামের বিলাসবহুল ভবনে তাদের দু’টি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা, আগ্নেয়াস্ত্র, বিদেশী মদসহ অনেক অবৈধ সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়। পরে দিন ২৪ ফেব্রুয়ারি জাল টাকা উদ্ধার, অস্ত্র ও মাদকের পৃথক তিন মামলায় পাপিয়ার ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তার স্বামী মফিজুর রহমানেরও ১৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা করা হয়। এছাড়া মামলার অপর দুই আসামি পাপিয়ার সহযোগী সাব্বির খন্দকার ও শেখ তায়্যিবাকেও রিমান্ডে নেয়া হয়। মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

Leave a Comment