রাজনীতি

রাজনীতিতে তোষামোদ ও তৈলমর্দনের সর্বনাশা কৌশল

ন্যুট সিউয়েনসন পরিচিত ছিলেন ন্যুট দ্য গ্রেট অথবা ক্যানিউট নামে। তিনি ছিলেন একাধারে ডেনমার্ক, ইংল্যান্ড ও নরওয়ের রাজা। এই সাম্রাজ্যকে উত্তর সাগর সাম্রাজ্যও বলা হতো। তার জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টীয় ৯৯০ সালে এবং মৃত্যু হয়েছিল ইংল্যান্ডের শ্যাফটেস বুরিতে ১০৩৫ সালের ১২ নভেম্বর। তিনি রাজা ক্যানিউট নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দুঃসাহসী যোদ্ধা, যার পক্ষে বিশাল একটি সাম্রাজ্য গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল। রাজা ক্যানিউট সমুদ্রতটে বেড়াতে পছন্দ করতেন।

তিনি যখন সমুদ্রতটে বেড়াতেন তখন তার সঙ্গে থাকত পারিষদ দল। পারিষদরা তাকে তুষ্ট করার জন্য তার অপরিসীম ক্ষমতা সম্পর্কে নানারকম কথা বলত; কিন্তু রাজা ক্যানিউট পারিষদদের তোষামোদে গলে যেতেন না। তিনি বলতেন, সমুদ্রে যে জোয়ার উঠছে তার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ঈশ্বরের সর্বোচ্চ শক্তির ওপর জাগতিক যে কোনো শক্তি তুচ্ছ বিবেচিত হয়। রাজা ক্যানিউট সমুদ্রের উত্তাল জোয়ারকে রোধ করতে পারেন না বলে নিজের ক্ষুদ্রতা পারিষদদের কাছে জ্ঞাপন করেছিলেন।

তবে ক্যানিউট সম্পর্কে এ গল্পটির বিভিন্ন আখ্যান রয়েছে। কেউ কেউ এ সম্পর্কে বলেছেন, ঈশ্বরের অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে জাগতিক যে কোনো শক্তি অসহায়, এমনটাই ফুটে উঠেছে এই গল্পের মধ্যে। আবার কেউ কেউ বলেছেন, রাজা ক্যানিউট মনে করতেন তার আধ্যাত্মিক শক্তি রয়েছে; কিন্তু এ সম্পর্কে হান্টিংডনের গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

হান্টিংডনের বর্ণনানুযায়ী, রাজা ক্যানিউট সমুদ্রতীরে তার সিংহাসনটি স্থাপন করে অগ্রসরমান জোয়ারকে নির্দেশ দিলেন থামতে এবং তার পায়ের পাতা এবং রাজকীয় ভূষণ না ভিজিয়ে ফেলতে। রাজার এ নির্দেশ সত্ত্বেও জোয়ার এসে তার পায়ের ওপর ভেসে গেল। জোয়ার রাজার ক্ষমতার প্রতি কোনোরকম আনুগত্য দেখাল না। রাজা ক্যানিউট পেছনের দিকে লাফিয়ে গিয়ে বললেন, সব মানুষ জানুক রাজার ক্ষমতা কতটা শূন্য এবং মূল্যহীন। কিন্তু ঈশ্বরকে স্বর্গ-মর্ত্য এবং সমুদ্র শাশ্বত নিয়মানুযায়ী মেনে চলে।

এরপর রাজা তার সোনার মুকুটটি ক্রুশের ওপর স্থাপন করলেন এবং এরপর তিনি আর কখনও এই মুকুট মস্তকে ধারণ করেননি। ক্ষমতাধর রাজা ঈশ্বরের প্রতি সম্মান দেখাতে গিয়ে এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। অথচ তার পারিষদরা তাকে তোষামোদ করার জন্য বলেছিল, তিনি নির্দেশ দিলে সমুদ্রের জোয়ারও থেমে যাবে। কিন্তু রাজা ক্যানিউট তার পারিষদদের তোষামোদে বিভ্রান্ত হননি। তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন, সমুদ্রের জোয়ার তাকে মান্য করবে না। এটি বোঝানোর জন্য তিনি তার সিংহাসন সমুদ্র তীরে স্থাপন করেছিলেন।

সময়ের বিবর্তনে রাজা ক্যানিউট সম্পর্কে গল্পটির বিভিন্ন ভাষ্য প্রচলিত হয়েছে। আধুনিক সাংবাদিকতা ও রাজনীতিতে ক্যানিউটের গল্পটি তার ঔদ্ধত্য ও সমুদ্রের জোয়ার থামিয়ে দেয়ার প্রয়াস হিসেবেই বর্ণনা করা হয়।

থিওডোর ডালরিম্পল রাজা ক্যানিউটের ঔদ্ধত্যের প্রতি নির্দেশ না করে সমসাময়িক রাজনীতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা আছে অথবা রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি আছে তারা মিথ্যা মোহে ভাবতে শুরু করেন যে, তারা ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। এ কারণেই রাজা ক্যানিউটের গল্পটি এখনও প্রচলিত আছে এবং ভবিষ্যতেও প্রচলিত থাকবে। সমসাময়িক রাজনীতিতে ক্ষমতার মদ-মত্ততার অনেক দৃষ্টান্ত আছে। ক্ষমতার বাড়াবাড়ি সম্পর্কে দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে রাজা ক্যানিউটের গল্পটি বারবার ফিরে আসে। মোসাহেব ও তোষামোদকারীরা সব যুগেই ছিল এবং এখনও আছে। ক্ষমতা চর্চা যতদিন থাকবে মোসাহেবী এবং তোষামোদও ততদিন অব্যাহত থাকবে।

তোষামোদের ফলে অনেক শাসক বিভ্রান্ত হয়েছেন। ফলে তারা এমন সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, যা সমাজ ও জাতির জন্য কল্যাণকর হয়নি, বরং ক্ষতিকর হয়েছে। অধিকাংশ শাসক যাদের শেষ পরিণতি মর্মান্তিক ঘটনায় পর্যবসিত হয়েছে, তাদের এই সর্বনাশের জন্য চাটুকার এবং তোষামোদকারীরাই দায়ী। যেসব ব্যক্তি ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করেন তারা অনুগত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতে পছন্দ করেন।

এসব অনুগত ব্যক্তির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল ক্ষমতার আসনে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির গুণকীর্তন করা এবং তিনি কোনো ধরনের ভুল করতে পারেন না- এমন ধরনের মনোভাব তার হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত করে দেয়া। রাজা-বাদশা, প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি ইত্যাদি ব্যক্তিরা এমন এক কুঠুরিতে আসন গাড়েন যেখানে সমালোচকদের কোনো প্রবেশাধিকার থাকে না। ফলে এদের একই ধরনের কথা বারবার শুনতে হয়।

একই কথা বারবার শোনার ফলে তারা ওই কথার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে যান। রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলো ভিন্ন আদলে দেখার সুযোগ আছে, এরকম কোনো ভাবনা তাদের মনের কোণে ঠাঁই পায় না। একের পর এক বিভ্রান্তিকর যন্ত্রণা তাদের অন্ধ করে ফেলে। ফলে ক্রমপুঞ্জীভূত ভুলের পাহাড় ক্রমাগতভাবে উচ্চ থেকে উচ্চতর হয়ে ওঠে। তারা এভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং এক সময়ে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।

কেউ কেউ বলবেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুক্ত গণমাধ্যম ক্ষমতাধরদের ভুল-ভ্রান্তিগুলো প্রকাশ করে দেয়। শুধু প্রকাশই করে না, সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে সে সম্পর্কেও আলোকপাত করে। উচ্চপর্যায়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিরা যদি গণমাধ্যমের এসব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকেন, তাহলে তাদের পক্ষে ভুলভ্রান্তি শুধরে নেয়া সম্ভব হয়। কিন্তু যদি গণমাধ্যমকে পোষ মানতে বাধ্য করা হয় অথবা ভয়াবহ সব আইন-কানুনের বেড়াজালে আবদ্ধ করা হয় তখন গণমাধ্যমও হক কথাটি বলতে পারে না। এরকম পরিস্থিতিতে গণমাধ্যম স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কী লিখলে বা কী বললে বিপদ হতে পারে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা থাকে না।

ফলে উচ্চ মহলের সমালোচনা এড়িয়ে চলাই বেহেতর মনে হয়। মুক্ত গণমাধ্যম গড়ে ওঠার পথে আরও অনেক রকম বাধা আছে। যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো নির্দিষ্ট মতবাদে বিশ্বাসীদেরই গণমাধ্যমের লাইসেন্স দেয়া হয় তাহলে এরকম গণমাধ্যম থেকে ভিন্ন ধরনের কোনো মতবাদ, মন্তব্য এবং সংবাদও পরিবেশিত হবে না। শাসকরা যে রকমটি পছন্দ করেন, সে রকমভাবেই সবকিছু পরিবেশিত হবে। মুক্ত গণমাধ্যমের আরেকটি বড় অন্তরায় হল মালিকানার ধরন। একটি সংবাদপত্র কিংবা একটি টিভি চ্যানেল চালু করতে হলে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। শত-সহস্র কোটি টাকার মালিক ছাড়া অন্য কারও পক্ষে এ ধরনের প্রয়াস সম্ভব হয় না।

এমন ধনী ব্যক্তিরা সবসময় সচেষ্ট থাকেন নিজেদের ধন-সম্পদ রক্ষা এবং পরিবর্ধনের কাজে। এরা কি একটি সাহসী এবং ন্যায়-নীতি আশ্রয়ী গণমাধ্যম উপহার দিতে পারেন? এসব ব্যক্তি তাদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমকে নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থসংরক্ষণের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। যে শাসনব্যবস্থায় শাসকরা অনুগত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন এবং মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবর্তে পোষ মানা গণমাধ্যম দ্বারা পরিবৃত থাকেন সেখানে শাসকবদের উচিত কথা কে শোনাবে? এমন পরিস্থিতিতে শাসকরা হয়ে ওঠে উদ্যত ও ক্ষমতাদর্পী। এ পরিস্থিতির সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ন্যূনতম সাযুজ্য থাকে না এবং শাসকরা হয়ে ওঠে স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্বপরায়ণ।

এখন মুজিববর্ষের কাউন্টডাউন চলছে। মুজিববর্ষের শুরুটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। মুজিববর্ষকে কেন্দ্র করে অর্থহীন বাড়াবাড়ির মাধ্যমে কোনো কোনো মহল নিজেদের আখের গোছাতে তৎপর রয়েছে। এরা এই বছরটিকে বাড়তি কামাইয়ের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। বাংলাদেশ প্রতিদিনের ৩ মার্চ সংখ্যায় পরিবেশিত সংবাদে লেখা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুজিববর্ষে দেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না…. মুজিববর্ষের নামে অহেতুক বাড়াবাড়ি বা কোনো অর্থের অপচয় না করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে মুজিববর্ষের নামে দেশের যত্রতত্র বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ না করারও নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।

বিরক্তি প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির ওপরও। …..অন্যদিকে বৈঠক শেষে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, মুজিববর্ষে বড় বাজেটের কোনো কর্মসূচি না নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠক সূত্র জানায়, মুজিববর্ষ উপলক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণবিষয়ক একটি প্রকল্পের প্রস্তাব বৈঠকে উত্থাপন করা হলে সেটি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করেন। … বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দিয়েছেন দেশের যেখানে-সেখানে যেনতেনভাবে যেন বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপন না করা হয়। এতে অর্থের অপচয় হবে।

সেই অর্থ দিয়ে গৃহহীনদের বাড়ি নির্মাণ করে দেয়ার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।’ একই সংবাদে জানা যায়, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৯ ফেব্রুয়ারি বগুড়া পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবনির্মিত ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের বঙ্গবন্ধুর মুখোশ পরা নিয়ে চরম বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি এজন্য শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির প্রতি ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। এ সময় শিক্ষামন্ত্রী বলেন, তিনি এ বিষয়টি জানতেন না। সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ভবিষ্যতে যেন এরকম কোনো ঘটনা আর না ঘটে সেদিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে।’

কোনো বিশাল ব্যক্তিত্বের মুখোশ পরলেই সেই ব্যক্তিত্বকে অন্তরে ধারণ করা হয় না। বরং এ ধরনের সুরুচিবর্জিত কাজ সেই ব্যক্তিত্বকে খেলো করে ফেলে। এছাড়া শুধু বাড়াবাড়ি না করার নির্দেশনাই যথেষ্ট নয়। কী করলে বাড়াবাড়ি হবে তার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকা বাঞ্ছনীয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মুজিববর্ষ পালনের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কত টাকা ব্যয় হবে সেটাও স্বচ্ছতার স্বার্থে জনগণকে জানানো উচিত। তবে বাড়াবাড়ি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তি প্রকাশ প্রশংসনীয়। বাড়াবাড়ি কতদূর ঠেকিয়ে রাখা যাবে তা নিয়েও দুর্ভাবনার যথার্থতা রয়েছে।

যেমন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানতেন না বগুড়ার পুলিশ লাইন স্কুল ও কলেজে মুজিববর্ষের উসিলায় শেখ মুজিবুর রহমানের মুখোশ পরা হবে। এ ধরনের অনেক গর্হিত কাজ ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। তদুপরি একশ্রেণির চাঁদাবাজ ভালো কাজের নামে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারে। যে দেশে তোষামোদ ও গুণকীর্তনের রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে সে দেশের অবাঞ্ছিত এবং নান্দনিকতাবর্জিত কার্যকলাপ ঠেকিয়ে রাখা খুবই কঠিন।

দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, বাংলাদেশে তৈলবাজরা বরাবরই প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। যারা উচিত কথা বলেন এবং ঔচিত্যবোধে অটল তাদের প্রায়ই বিপদ ও ঝামেলায় পড়তে হয়। বাঙালিদের মধ্যে তৈলবাজদের বাড়-বাড়ন্ত দেখে পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছিলেন, ‘‘কিন্তু খুবই পরিতাপের বিষয়, সমাজ রূপান্তরের পরিক্রমায় ‘তেল’ শব্দটির প্রয়োগ নেতিবাচক অর্থে প্রচলিত হয়েছে। কেননা, মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনে যেখানে শক্তি-বিদ্যা ধন-কৌশল প্রভৃতি কোনো কাজে আসে না, তখন ‘তেল’ বেশ কাজ দেয়।

‘তেল’ শব্দটির এখানে তাৎপর্যগত অর্থ দাঁড়ায় মিথ্যা প্রশংসা বা লোক দেখানো স্তুতি। তার মানে, স্নেহ বা শ্রদ্ধা তার চরিত্র হারিয়ে মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করলে তা ‘তেল’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। …বাস্তবিকই ‘তেল’ সর্বশক্তিমান। …যে সর্বশক্তিময় ‘তৈল’ ব্যবহার করিতে জানে, সে সর্বশক্তিমান। তাহার কাছে জগতের সব কাজই সোজা, তাহার চাকরির জন্য ভাবিতে হয় না- উকিলিতে প্রসার করিবার জন্য সময় নষ্ট করিতে হয় না, বিনা কাজে বসিয়া থাকিতে হয় না, কোনো কাজেই শিক্ষানবিস থাকিতে হয় না। যে ‘তৈল’ দিতে পারিবে তাহার বিদ্যা না থাকিলেও সে প্রফেসর হইতে পারে, আহাম্মক হইলেও ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারে, সাহস না থাকলেও সেনাপতি হইতে পারে এবং দুর্লভরাম হইয়াও উড়িষ্যার গভর্নর হইতে পারে।’’

সমসাময়িক বাংলাদেশে ম্যাজিস্ট্রেট বা গভর্নর হওয়ার চেয়ে বড় আকর্ষণ হল কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া। এজন্য দুর্বৃত্তপনার আশ্রয় নিতে হয়। দুর্বৃত্তপনাকে জায়েজ করার জন্য তৈলমর্দনের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়। দুষ্ট লোকরা বলেন, পায়ে সরিষার তেল মাখলে আরামবোধ হয়; কিন্তু চোখে মাখলে জ্বালাবোধ হয়। তাই কোথায় তৈলমর্দন করতে হবে তার জন্যও কুশলী হতে হয়। দেশে এমন কুশলী লোকের অভাব নেই।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Leave a Comment