লাইফস্টাইল

স্বাবলম্বী হোক তারাও

কেউ খেলার ছলে বুদ্‌বুদ ওড়াচ্ছে, কেউ দিচ্ছে ব্লকের ছাপ। কেউ আবার বাড়ি বানাচ্ছে তলার পর তলা। কাজের বাইরে অন্য দিকে কোনো মনোযোগ নেই কারও। হাসানুর রহমান জানালেন, ‘ওরা এমনই। যখন মন যেদিকে থাকবে, পুরো মনোযোগ সেখানেই দেবে। আবার ভালো না লাগলে, কাউকে জোর করেও বসিয়ে রাখতে পারবেন না। ওরা আসলে গড গিফটেড।’

বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের নিয়ে একটি নতুন উদ্যোগ স্বাবলম্বী নামের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। অবলম্বন ট্রাস্টের মাধ্যমে পরিচালিত এই স্কুল গত বছরের শেষ দিকে যাত্রা শুরু করে। এই ট্রাস্টের সদস্য দলে হাসানুর রহমান ছাড়াও আছেন রাগিব আহসান, ফারহানা সুলতানা, নাসিমা খান ও কনিকা আক্তার। গত জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে স্বাবলম্বীর শিক্ষা কার্যক্রম। বর্তমানে স্কুলটিতে ১৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। আর এই ১৫ জন শিক্ষার্থীকে শেখানোর জন্য আছেন ১৬ জন শিক্ষক।

রাজধানীর আফতাবনগর জহিরুল ইসলাম সিটির ৬ নম্বর সড়কের জি ব্লকের ২৯ নম্বর বাড়ির পাঁচতলাজুড়ে চলছে স্বাবলম্বী স্কুলের কার্যক্রম। স্কুলের চারদিকে ফাঁকা জায়গা থাকায় সম্পূর্ণ নিরিবিলি পরিবেশ। তবে বাড়িটিতে প্রবেশ করলেই দেখা যাবে শিক্ষার্থীদের নানা রকম কার্যক্রম। নিচতলার একটি পাশজুড়ে বানানো হয়েছে আধুনিক থেরাপি ও সেন্সরি প্লে ইউনিট। অবলম্বন ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক হাসানুর রহমান বলেন, ‘অটিস্টিক বাচ্চাদের নানা রকম থেরাপি দরকার পড়ে। এই প্লে ইউনিটে খেলাচ্ছলেই শিশুদের হাত, পা ও শরীরের নানা রকম থেরাপি হয়ে যায়। প্রতিটি উপকরণ তৈরির আগে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে সেভাবে তৈরির চেষ্টা করেছি।’

শেখানো হচ্ছে ব্লকপ্রিন্ট
শেখানো হচ্ছে ব্লকপ্রিন্ট
বিশেষভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য তৈরি এই স্কুলের প্রতিটি আসবাব থেকে পাঠকৌশল সবই বিদেশি অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া বলে জানাল কর্তৃপক্ষ। আফতাবনগরের এই স্কুলের আশপাশে এখনো পর্যাপ্ত খোলা জায়গা । তাই শিক্ষার্থীদের ঘাসে বা মাটিতে হাঁটানোর দরকার পড়লেও সেই সুবিধা মিলছে প্রাকৃতিকভাবে। স্কুলটির উদ্যোক্তাদের কয়েকজনের সন্তানও অটিজমে আক্রান্ত। তাই অভিভাবকদের চাহিদা ও এসব বিশেষ শিশুদের চাহিদা সম্পর্কে বেশ ভালো জানাশোনা আছে তাঁদের। অবলম্বন ট্রাস্টের সভাপতি রাগিব আহসান জানালেন, ‘আমাদের সন্তানেরা বিভিন্ন স্কুলে পড়েছে। সেখানে যেসব বিষয়ে ঘাটতি মনে হয়েছে, সেগুলোকে আমরা চিহ্নিত করে এই স্কুলের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করছি। আর তাই আমরা এটাকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতে চাইছি।’

প্রতিষ্ঠানটির কোষাধ্যক্ষ ফারহানা সুলতানা যোগ করলেন, ‘এখানে বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েদের জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছি আমরা, যাতে তারা কর্মক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাজ করতে পারে সমানতালে।’

শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে খেলছে এক শিক্ষার্থী
শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে খেলছে এক শিক্ষার্থী
আলাপ করতে করতেই দোতলার একটি ঘরে এলাম আমরা। হাসানুর রহমান দেখালেন বিশেষ ধরনের কয়েকটি টিউব। রঙিন আলোর এই টিউবের ভেতর দিয়ে বুদ্‌বুদ উঠতে থাকে সচল করার পর থেকে। আলো–আঁধারি এই ঘরে এসে শিশুরা নিজেদের স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়ে। আরেক পাশে বোর্ডের ওপর নানা রকম নরম মাজুনি বসানো। এটাতে হাত রাখলে শিশুদের হাতের স্নায়ুগুলোর জড়তা কেটে সচল হতে থাকে।

আরও একতলা উঠে দেখা মিলল গল্পবাড়ির। যেখানে ফ্লোরে মাদুর পেতে শিশুদের নিয়ে বসেন শিক্ষকেরা। আর সামনে একটি ছোট্ট ছাউনি দেওয়া জায়গায় বসে একজন শিক্ষক গল্প শোনান শিশুদের। এক দিকে হাতে–কলমে শেখানোর জন্য আছে নানা রকম আয়োজন। ব্লক–বাটিকের কাজ শেখানো, হাতের কাজসহ নানা রকম জীবনমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সকাল আটটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত কয়েকটি শিফটে চলে স্কুলের কার্যক্রম। যেখানে পড়তে ৭ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হবে শিফটভেদে।

প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একজন করে শিক্ষকের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে শুনে প্রশ্ন করলাম, শিক্ষার্থী বাড়লে? উত্তর এল রাগিব আহসানের কাছ থেকে, ‘শিক্ষকও বাড়বে। আমরা তো শিশুদের শেখাতে চাইছি নিজেদের তাড়না থেকে। আয় করা এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য নয়। আমরা তাদের একটি মানবিক পৃথিবীতে রেখে যেতে চাই, যেখানে তারা নিজের মতো করে বাঁচতে পারবে কারও সাহায্য ছাড়াই।’

রঙিন কাপড়ে শিশুদের ব্লকের ছাপ দেওয়া দেখলে সেটা যে কারও মনে হবে।

Leave a Comment